কারা সেই কালো পতাকাবাহী দল?

কারা সেই কালোপতাকাবাহী দল?জান্নাতী ফেরকা, গুরাবা ও কালোপতাকাবাহী দল কি আলাদা দল? কোরআন-হাদিস, যুক্তির আলোকে একটি পর্যালোচনা।

কারা সেই খোরাসানের কালোপতাকাবাহী দল, কারাই বা সে গুরাবা, কোনটাই বা সেই সঠিক দল যাদের কথা রাসূল সাঃ অনেকবার বিভিন্ন হাদিসে বলেছেন, তাদের মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন, কেনোই বা এই কালোপতাকাবাহী দলের এতো গুরুত্ব এ সম্পর্কে সঠিকটা জানতে আমাদেরকে অবশ্যই আরবে ইসলামের সূচনা থেকে শুরু করতে হবে । অন্যথায়, আমরা পদে পদে বিভ্রান্ত হবো । ইতোমধ্যে সেই বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে মুসলিম জাতির অনেকেই নিজের অজান্তে খোদ ইসলামেরই ক্ষতি করে চলছে । তাই গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টিকে গুরুত্বহীনভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই ।

কারা সেই কালো পতাকাবাহী দল

প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে । তৎকালীন আরবের বুকে বর্বরীয় সভ্যতার রাজত্ব চলছিলো । সম্ভ্রান্ত পরিবার ব্যতীত তখন মানুষকে মানুষ মনে করা হতো না । হাটে-বাজারে মানুষ কেনাবেচা হতো । যেনো প্রাচীন গ্রীসের দাসপ্রথা আরবের মরুভূমিতে এসে নতুন মাত্রা পেয়েছিলো । নারীকে তখন চরম অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা হতো । এতিম-মিসকীনদের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আত্মীয়-স্বজন, সম্পদ ও ক্ষমতাশালীরা ভাগ বসাতো, দখল করে নিতো । কেবলমাত্র উত্তরাধিকার সম্পত্তি ভোগ করার জন্য পিতার মৃত্যুর পর সৎমাকে পর্যন্ত বিয়ে করার প্রথা ছিলো । কন্যা শিশুকে জন্ম দেয়া মানে তখন যথেষ্ট সম্মানহানির ব্যাপার হিশেবে দেখা হতো ।

তাই জন্মের সাথে সাথে মরুভূমির তপ্ত বালুর নিচে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়তো নিষ্পাপ শিশুকন্যারা । সেই সময়ে গোত্রে গোত্রে চলতো সংঘর্ষ, রক্ত প্রতিশোধপরায়ণতা, জোরজোবরদস্তি হত্যা ইত্যাদি । আর আবু জাহেলের মতো ধর্মব্যবসায়ী আলেম শ্রেণিটি পবিত্র কাবা ঘরকে বানিয়ে রেখেছিলো ধর্মব্যবসার প্রাণকেন্দ্র। হজ্জ করার উদ্দেশ্যে দূরদূরান্ত থেকে আগত কাফেলাতে রাতের অন্ধকারে হামলা করতো মক্কার দুর্বৃত্তরা । সমাজে শান্তির ছায়াটুকুও ছিলো না । ছিলোনা মানবতার সামান্যতম সহমর্মিতা, সহানুভূতিতা ।  অথচ তারাও আজকের মুসলিমদের ন্যায় আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিশেবে মানতো, নামাজ পড়তো, রোজা রাখতো, হজ্জ করতো, কাবাঘর তাওয়াফ করতো, যাকাত দিতো ।

এই ছিলো আরবের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থা, এই ছিলো আরবীয় মানুষের চরিত্র । ইতিহাসে এই যুগ 'আইয়্যামে জাহেলিয়াত' বা অন্ধাকারাচ্ছন্ন যুগ নামে ঠাঁয় পায় । এটা আমরা প্রায় সবাই কমবেশি জানি । এমনই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে, এমনই ঘোরতর বিপদসংকুল পরিবেশে আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সাঃ কে প্রেরণ করলেন । একটা প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে, তারা যদি আল্লাহ আল্লাহ হিশেবে মানে, নামায-রোজা-যাকাত-হজ্জ করে তাহলে কেনো রাসূল সাঃ কে পাঠানো হলো? মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলার জন্য? এটা বোকারাও মানবে, সামান্য মূর্তি ভাঙ্গার জন্য একজন রাসূলের প্রয়োজন ছিলো না, প্রয়োজন ছিলো না কোরআন অবতীর্ণের, প্রয়োজন ছিলো না কাবাঘরের ৩৬০ টি মূর্তি ভাঙ্গার পর আমৃত্যু সশস্ত্র সংগ্রাম করার জন্য । তাহলে রাসূল সাঃ কে কেনো আল্লাহ প্রেরণ করলেন? কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, “আপনার (মুহাম্মদ সাঃ) পূর্বে আমি (আল্লাহ) যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাঁকে এ আদেশেই প্রেরণ করেছি যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থ্যাৎ আমি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ (সার্বভৌমের মালিক বা হুকুমদাতা) নেই । ” (সূরা আম্বিয়াঃ ২৫) ।

তাই রাসূল সাঃ আরবের মানুষকে এসে বললেন না তোমাদের নামায হচ্ছে না, যাকাত হচ্ছে না, রোজা হচ্ছে না, বরং তিনি সর্বপ্রথম তওহীদের বালাগ দিলেন, অর্থ্যাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে বললেন । কারণ, তারা আল্লাহকে আল্লাহ হিশেবে ঠিকই মানতো, নামায-রোজা-যাকাত-হজ্জ সবই করতো; শুধু হুকুমদাতা বা সার্বভৌমের জায়গায় আল্লাহর পরিবর্তে তাদের তৈরি লাত-মানাত-উজ্জা প্রভৃতিকে মানতো । আল্লাহকে হুকুমদাতা (ইলাহ) না মানায় পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র অন্যায়-অবিচার-অশান্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো ।

অথচ আজকে আমরাও আল্লাহকে ইলাহের আসন থেকে সরিয়ে মাবুদে বসিয়ে দিয়েছি, যেটা তৎকালীন আরবের মানুষরা করেছিলো । তাই আমরা ইলাহর অর্থ হুকুমদাতা না করে উপাস্য করেছি । রাসূল সাঃ এর এই আহ্বান শুনে গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া সবাই বলাবলি শুরু করলো, আরবের মুহাম্মদ পাগল হয়ে গেছে । এই অশিক্ষিত যুবকটি বলে কিনা আমরা এতোদিন যা মানছি তা মিথ্যে, আমরা এতোদিন ধরে বাপদাদাদের নিয়মে মেনে চলছি ,সব ভুল । কী অদ্ভূত (আরবীতে গরিব, ইংরেজিতে Strange) কথা ! কী গরিব কথা! সবার কাছে আশ্চর্যজনক বা অদ্ভূত মনে হচ্ছিলো । অথচ মক্কায় তো আল্লাহ প্রদত্ত ইব্রাহিমী ধর্ম ছিলো । রাসূল সাঃ এর বর্ণিত ধর্মও তো আল্লাহ প্রদত্ত । এ ধর্মের কথা শুনে তো আশ্চর্য্য হওয়ার কথা ছিলো না । তাহলে তারা আশ্চর্য্য হলো কেনো? হলো এ কারণেই কালক্রমে তারা ইব্রাহিমী ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছিলো । মূল তওহীদ থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের মনগড়া আইন দিয়ে সকল ধরণের বিচারকার্য করছিলো । যা সিদ্ধান্ত নিতো তা লাত-মানাতের নামে চালিয়ে দিতো । অর্থ্যাৎ সার্বভৌমের জায়গায় আল্লাহর পরিবর্তে লাত-মানাত প্রভৃতি দেবদেবীকে বসিয়ে দিয়েছিলো । ধর্মকে পুঁজি করে আলেম শ্রেণিটি ধর্মব্যবসা শুরু করেছিলো । বাপ-দাদারা যা করে এসেছে, তাই অন্ধভাবে অনুসরণ করতো । সেই বিকৃতি ধর্মটি পালন করতে করতে তারা এমন অবস্থায় এসে পৌছুল যে, রাসূল সাঃ যে প্রকৃত ধর্মটি উপস্থাপন করলো, তা তাদের কাছে নতুন মনে হলো, সেই তওহীদের কথা নতুন মনে হলো, অদ্ভূত মনে হলো । সংক্ষেপে এই ছিলো আরবে ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাস ।

রাসূল সাঃ অক্লান্ত পরিশ্রম করে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে আরবের বুকে দীনুল হক বা সত্য জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করলেন । তাঁর হাতে গড়া সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ উম্মতে মোহাম্মদী জাতিটির উপর বাকি পৃথিবীতে সত্য জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে গেলেন । পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের অভিজ্ঞতার আলোকে, যাওয়ার আগে তিনি অনেকবার সেই হাতে গড়া জাতিটিকে বিভিন্নভাবে সতর্কবাণী করে গেছেন, যাতে মর্মান্তিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না হয় ।  রাসূল সাঃ বলেন, “নিশ্চয় ইসলাম উৎপত্তি লাভ করেছে অদ্ভূতজনক (গরিব, Strange) অবস্থায় এবং তা অচিরেই প্রত্যাবর্তন করবে অদ্ভূতজনক (গরিব, Strange) অবস্থায় । সুতরাং মোবারকবাদ ঐ দিন সেইসব অদ্ভূত মানুষদের (গোরাবা, Strangers) জন্য, যখন যামানা বিনষ্ট হয়ে যাবে। যাঁর হাতে আবূল কাসিমের জীবন! সেই সত্তার শপথ! ইসলাম এই দুই মসজিদের মধ্যবর্তী স্থানে প্রবেশ করবে, সর্প যেমন তার গর্তে প্রবেশ করে থাকে ।" [সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মুসনাদে আহমেদ(ইফা)- অধ্যায়ঃ ২, হাদিস নং ৯৯; সহীহ মুসিলম]

এই হাদিস থেকে স্পষ্টত বুঝা যায়, রাসূল সাঃ সন্দেহ করেছিলেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইসলামটিতে অচিরেই বিকৃতি ঘটবে । মানুষ প্রকৃত ইসলাম থেকে সরে গিয়ে বিকৃত ইসলাম নিয়ে পড়ে থাকবে । সাপ যেমন প্রশস্ত ভূপৃষ্ঠ তার সরু গর্তে ঢুকে, প্রকৃত প্রশস্ত ইসলাম তেমনি সংকীর্ণ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে । আইয়্যামে জাহেলিয়াত যুগে প্রকৃত ইসলামটি যেমন অদ্ভূতজনক (গরিব বা Strange) অবস্থায় উৎপত্তি লাভ করেছিলো অর্থ্যাৎ প্রকৃত ইসলামটির কথা শুনে যেমন সবাই আশ্চর্য্য হয়ে গিয়েছিলো, তেমনি রাসূল সাঃ এর পরে সেই প্রকৃত ইসলামটির কথা শুনে সবাই আশ্চর্য্য হয়ে বলবে, এ কোন গরিব কথা বলছো? এ কোন অদ্ভূত ইসলামের কথা বলছো । অর্থ্যাৎ বিকৃত ইসলামের আড়ালে ঢেকে থাকা প্রকৃত ইসলাম দেখে সবাই অবাক হয়ে যাবে । রাসূল সাঃ এর আরেকটি হাদিসে তিনি বলেছেন, “আমার উম্মতের আয়ু হবে ৬০/৭০ বছর ।" [আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, আত তিরমিযীঃ ৩৫৫০, ইবনে মাজাহ ৪২৩৬, সিলসিলাত আস সাহীহ গ্রন্থে আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন] ।

আমরা সাধারণ এই হাদিসটিকে আমাদের জীবনায়ুর সাথে তুলনা করি । সত্যিকার্থে হাদিসটিতে তা বুঝানো হয় নি । রাসূল সাঃ যে উম্মতে মোহাম্মদীকে দায়িত্ব দিয়ে গেলেন, তারা রাসূল সাঃ এর ওফাতের মাত্র ৬০/৭০ বছরের মাথায় সহজ সরল ইসলামে ফেরকা-মাজহাবে বিভক্ত করে তারা রাসূল সাঃ এর উম্মত হওয়ার সৌভাগ্য হারালো । হারালো এই কারণে, কোরআনে আল্লাহ অনেকবার বলেছেন, সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে, ঐক্যহীন না হতে, বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত না হতে । সাবধান করে দিয়েছিলেন এই বলে যে, “তোমরা সকলে একত্রিত হয়ে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়িয়ে ধর, সাবধান! বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সূরা আল ইমরান-৩, আঃ ১০৩) শুধু তাই নয়, আল্লাহ সরাসরি বলে দিয়েছেন, “যারা নিজেদের দ্বীনকে খন্ড খন্ড করে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের সাথে আপনার (হে রাসূল) কোন সম্পর্ক নেই।” (সূরা আনআম-৬, আঃ-১৫৯) যাদের সাথে রাসূল সাঃ-এর কোনো সম্পর্কই নেই, তারা কী করে রাসূল সাঃ-এর উম্মত হয়? এটা তো খুবই স্বাভাবিক কথা । সত্যি সত্যিই মাত্র ৬০/৭০ বছরের মাথায় রাসূল সাঃ -এর হাদিসটির সত্যায়ন ঘটলো । আমরা আর উম্মতে মোহাম্মদী রইলাম না । যতই দিন যেতে লাগলো ততই ইসলামের বিকৃতি ঘটতে থাকলো, দলে উপদলে বিভক্তি হতে লাগলো । রাসূল সাঃ এই পরিস্থিতিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উপদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন, “আমি তোমাদের নিকট দু’টা জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা সে জিনিষ দু’টি আঁকড়িয়ে ধরে থাকবে, তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। এ দু’টা জিনিস হল আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।” [মেশকাত শরীফ, ১ম খন্ড, হাদীস নং- ১৭৭ ] কিন্তু সে সুযোগও রাখলোনা একটা শ্রেণি । কালক্রমে জন্ম নিলো ধর্মব্যবসায়ী আলেম শ্রেণিটি । তারা পার্থিব স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করতে শুরু করলো । তারা কোরআন-হাদিস ও বিভিন্ন ফতোয়া-মাসলামাসায়েলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে সেরাতুল মোস্তাকীম অর্থ্যাৎ সহজ সরল ধর্মটিকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে ফেললো । দীনের অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোকে কম গুরুত্বপূর্র্ণ আর কম গুরুত্বপূর্ণ জিনিসকে অতি গুরুত্বপূর্র্ণ করে তুললো । অথচ রাসূল সাঃ বলেছেন, “নিশ্চয় দীন সহজ। দীনকে যে কঠোর করতে যাবে, তা তার জন্য কঠোর হয়ে পড়বে। সুতরাং তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং মধ্যপন্থার নিকটবর্তী থাকো আর শুভ সংবাদ গ্রহণ কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের শেষাংশে (ইবাদতের মাধ্যমে) আল্লাহর সাহায্য চাও।" [আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, সহীহুল বুখারী: হা/৩৯]

অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ফলে ভারসাম্যপূর্ণ দীনটি ভারসাম্যহীন হয়ে গেলো, সাধারণ মানুষের কাছে দীনুল হক বা সত্য জীবনব্যবস্থা দুর্বোধ্যে ঠেকলো । কোনটা সঠিক সুন্নাহ আর কোনটি বেঠিক সুন্নাহ – বিভ্রান্তিতে পড়লো সাধারণ মুসলিমরা । তারা এক পর্যায়ে ধর্মব্যবসায়ী আলেম শ্রেণিটির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লো । আর আলেম শ্রেণিটি পার্থিব স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ শুরু করলো, যেটা আজ পর্যন্ত চলছে এবং ব্যাপক হারে । কিন্তু আল্লাহ ও রাসূল সাঃ ধর্মের বিনিময় নেয়াটাকে চরম ভাবে নিষেধ করেছেন । কোরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ যা গ্রন্থে অবতীর্ণ করেছেন তা যারা গোপন করে ও তৎপরিবর্তে সামান্য মূল্যও গ্রহণ করে, নিশ্চয় তারা স্ব স্ব উদরে আগুণ ছাড়া অন্য কিছু ভক্ষণ করে না এবং কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তারাই সুপথের বিনিময়ে গোমরাহী বা কুপথ এবং ক্ষমার পরিবতে শাস্তি ক্রয় করেছে, অতঃপর জাহান্নামের শাস্তি সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল?” (সূরা বাকারাহঃ ১৭৪ থেকে ১৭৫) আর রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমন কোন জ্ঞান অর্জন করল, যার দ্বারা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, তা সে কেবল পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে অর্জন করল, কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধ পর্যন্ত পাবে না।” - [হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে, আবূ দাউদ]

কী সাংঘাতিক কথা! অথচ এ বিষয়গুলো বর্তমান যুগের এক শ্রেণির আলেমদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা কথা ঘুরানোর চেষ্টা করেন । কিন্তু রাসূল সাঃ এদের সম্পর্কে বলেছেন, “যাকে ধর্মীয় জ্ঞান বিষয়ক কোন কথা জিজ্ঞাসা করা হয়, আর সে তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে।” [আবূ দাউদ, তিরমিযী, হাসান]

ধর্মীয় কাজের পারিশ্রমিক নেয়া হারাম এবং যে নিবে সেও জাহান্নামী। এ ব্যাপারে বিস্তারিত রেফারেন্সসহ এই পিডিএফ বইটি পড়ুন

কালক্রমে যে ইসলামের বিকৃতি হবে, রাসূল সাঃ এর সুন্নাহতে বিকৃতি ঘটবে তা তিনি অনেক হাদিসের মাধ্যমে বলে গিয়েছেন । যেমন- রাসূল সাঃ বলেন, “আমি অচিরেই লোকদের উপর এমন একটি সময় আসার আশংকা করছি, যখন কেবলমাত্র নাম ছাড়া ইসলামের আর কিছুই বাকি থাকবে না এবং কুরআনের লিখিত রূপটি ছাড়া তার বাস্তবায়ন থাকবে না। মসজিদগুলো চাকচিক্যে ভরপুর হলেও মানুষ হেদায়াত থেকে বঞ্চিত হবে। ঐ সময়কার আলেমরা হবে আসমানের নিচে বিচরণকারী সর্বনিকৃষ্ট জীব। তাদের থেকেই বিভিন্ন ফিতনা ছড়াবে এবং তারা নিজেরাও সেই ফিতনায় আবর্তিত হবে।” -[হযরত আলী থেকে বর্ণিত, সুনানে বায়হাকী]

আরেকটি হাদিসে বলেন, “ইসলামের রজ্জু একটা একটা করে ছিঁড়ে যাবে অর্থাৎ ইসলামের বিধান একটা একটা করে ছেড়ে দেয়া হবে। যখনই কোন একটি রজ্জু ছিঁড়ে যাবে, তখনই মানুষ এর পরবর্তী রজ্জু আঁকড়ে ধরবে। সর্বপ্রথম ছিড়ে যাবে, ‘হুকুম’ বা তওহীদ বা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব । আর সর্বশেষ ছিড়ে যাবে সালাত।” [আবূ উমামা আল-বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত; ইবনু হাব্বান বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ; মুসনাদে আহমেদ (ইফা)- অধ্যায়ঃ ২, হাদিস নং ১০৫]

আরেকটি হাদিসে রাসূল সাঃ বলেছেন, “আমার মনে হয় তোমরা আমার পরে তোমাদের মসজিদসমূহকে ইহুদিদের সিনাগোগ ও নাসারাদের গীর্জার ন্যায় বিশালাকার প্রাসাদরূপে তৈরি করবে ।” (ইবনে মাজাহঃ ৭৪০; আবু দাউদঃ ৪৪৮ নং হাদিস, রাবী ইবনু আব্বাস) শুধু তাই নয়, আনাস ইবুন মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত লোকেরা মসজিদের সৌন্দর্য্য ও সুসজ্জিতকরণ নিয়ে পরস্পর গর্ব না করবে ততক্ষণ কেয়ামাহ সংঘটিত হবেনা” । [মেশকাত শরীফঃ ৭১৯ নং হাদিস; ইবনে মাজাহঃ ৭৩৯ নং হাদিস; আবু দাউদঃ ৪৪৯, ৪৭৫ নং হাদিস; আহমদঃ ১১৯৭১, ১২০৬৪, ১২১২৮, ১২৯৯১, ১৩৬০৬ নং হাদিস]

অর্থ্যাৎ হাদিসগুলো থেকে সারাংশে বলা যায়, রাসূল সাঃ -এর ওফাতের পর একটা শ্রেণি ধর্মকে বিকৃতি করে ফেলবে । আকীদার বিকৃতি ঘটায় গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো গুরুত্বপূর্ণহীন হয়ে যাবে, আর গু গুরুত্বহীন জিনিসগুলো বেশি গুরুত্ব পাবে । যেমন তওহীদের ভিত্তিতে দীনুল হক প্রতিষ্ঠার চেয়ে গুরত্ব পাবে মসজিদগুলো চাকচিক্য করা, বাহ্যিক সুন্নত যেমন দাঁড়ি-টুপি রাখা ইত্যাদি । গুরুত্বের ওলটপালটে তাই সর্বপ্রথম ছিঁড়ে যাবে তওহীদ বা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব । এটা ছিঁড়ে যাবার ফলে মানুষ পরবর্তী গুরুত্বপূর্র্ণ যেমন সালাহকে আঁকড়ে ধরবে । যারা সহজ সরল দীনটিতে এতো ক্ষতি ডেকে আনলো, তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ আসমানের নিচে সর্বনিকৃষ্ট জীব বলবেন না তো কী বলবেন?

দীনের দুর্বোধ্যতায় আকীদাগত বিভ্রান্তিতে পড়ে ইসলাম দিনে দিনে বিকৃত হতে হতে প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে সরে যেতে লাগলো আর মুসলিম জাতিটি শতাধিক দলে উপদলে বিভক্ত হলো । সবাই নিজের দলকে সঠিক করেই ক্ষান্ত হলো না, তখন থেকে আজ পর্যন্ত সেই দাবি কোরআন হাদিস দিয়ে প্রমাণের চেষ্টা করে, এমনকি একদল আরেক দলের সাথে খুনোখুনি পর্যন্ত । রাসূল সাঃ কথা অনুযায়ী তাঁর রেখে যাওয়া মুসলিম জাতিটি ৭৩ দলে বিভক্ত হয়ে গেলো । আমরা যাতে সেই সঠিক দলটিতে আশ্রয় নিতে পারি এ জন্য রাসূল সাঃ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সেই দলের কথা বলেছেন ।
রাসূল সাঃ বলেছেন, “যখন তোমরা দেখবে, কালো পতাকাগুলো খোরাসানের দিক থেকে এসেছে, তখন তাদের সাথে যুক্ত হয়ে যেও । কেনোনা, তাদেরই মাঝে আল্লাহর খলিফা ইমাম মাহদী থাকবে” । [হযরত ছওবান রাঃ থেকে বর্ণিত, মুসনাদে আহমদ, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৭৭; কানজুল উম্মল, খন্ড ১৪, পৃষ্ঠা ২৪৬; মিশকাত শরীফ, কেয়ামতের আলামত অধ্যায়]

আরেকটি হাদিসে এসেছে, হযরত মাসউদ রাঃ বলেন, একদা আমরা নবী সাঃ এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম । উনি বলতে ছিলেন, “ঐ দিক থেকে একটি দল আসবে (হাত দিয়ে তিনি পূর্ব দিকে ইশারা করলেন), তারা কালো পতাকাবাহী হবে । তারা সত্যের দাবী জানাবে, কিন্তু তাদেরকে দেওয়া হবে না । দুইবার তিনবার এভাবে দাবী জানাবে, কিন্তু তখনকার শাসকগণ তা গ্রহণ করবেনা । শেষ পর্যন্ত তারা আমার পরিবারস্থ একজন লোকের হাতে সোপর্দ করে দিবে । সে জমিনকে ন্যায় ও নিষ্ঠার মাধ্যমে ভরে দিবে, ঠিক যেমন ইতিপূর্বে অন্যায় অত্যাচারের মাধ্যমে ভরে দেওয়া হয়েছিলো । সুতরাং তোমাদের কেউ ঐ সময় জীবিত থাকো, তবে অবশ্যই তাদের দলে এসে শরীক হয়ে যেও, যদিও বরফের উপর কনুইয়ে ভর দিয়ে আসতে হয়”। [আবু আমর আদ দাইনিঃ ৫৪৭, মুহাক্কিক আবু আব্দুল্লাহ সাফেঈ হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন]

এরকম আরো দুটি হাদিস । হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেন, “যখন কালো পতাকা পূর্ব থেকে বের হবে, তখন কোন বস্তু তাদেরকে প্রতিহত করতে সক্ষম হবেনা । এমনকি এই পতাকাকে ইলিয়ায় (বাইতুল মুকাদ্দাসে) উত্তোলন করবে”। [সুনানে তিরমিজী, হাদিস নং ২২৬৯; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ৮৭৬০]

 আব্দুল্লাহ ইবনে হারিস রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেন, “পূর্বদিক (খোরাসান) থেকে কিছু লোক বের হয়ে আসবে, যারা ইমাম মাহদীর খেলাফত প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে এবং খেলাফাত (তওহীদ ভিত্তিক দীনুল হক বা সত্য দ্বীন) প্রতিষ্ঠা সহজ করে দিবে” । [সহীহ মুসিলম, খন্ড-৩, হাদিস নং ২৮৯৬; ইবনে মাজাহঃ খন্ড-৩, হাদিস নং ৪০৮৮]

এই হাদিসগুলোতে চোখ বুলালেই বুঝা যায়, এই কালোপতাকাবাহী মূলত একটি দল যারা হক  এবং এদের সাথেই ইমাম মাহদী থাকবে । এই দলে ভিড়া এতোই গুরুত্বপূর্র্ণ যে, যদি বরফের উপর কনুই ভর করে যেতে হয় তবু যেতে হবে ।
কালো পতাকাবাহী দল সম্পর্কে সাধারণ মুসলিমরা যে তিনটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিতে পড়ে, তা হলো কালো পতাকা, খোরাসান ও ইমাম মাহদী আঃ কে নিয়ে । আক্ষরিক অর্থ ধরে যে দলগুলোর দলীয় পতাকা কালো সেগুলোকেই তারা সঠিক মনে করে ।
অথচ দলীয় পতাকা কালো এমন ইসলামী দল একাধিক রয়েছে । তাছাড়া কয়েকজন মানুষ মিলে যদি তাদের একটা দল প্রতিষ্ঠা করে এবং দলীয় পতাকা কালো বানিয়ে বলে, আমরাই সেই কালোপতাকাবাহী দল সেটা কোনো ক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয় । 
কালোপতাকাবাহী বলতে যে আক্ষরিক কালো পতাকাকে বুঝানো হয়নি, বরং কালেমায়ে তওহীদকেই বুঝানো হয়েছে - এটার প্রমাণ পাওয়া যায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলিতে । রাসূল সাঃ সর্বপ্রথম ইসলামের কোন জিনিসটি ছিঁড়ে যাবার কথা বলেছেন? প্রত্যেক নবী-রাসূল সর্বপ্রথম কিসের দিকে মানুষকে আহ্বান করেন? দীনুল হক তথা ইসলামের মূল ভিত্তি কি? কী প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূল সাঃকে সশস্ত্র যুদ্ধ করে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়? রাসূল সাঃ এর মূল সুন্নাহ কী? নিঃসন্দেহে একজবাবে এর উত্তর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা বা সার্বভৌমের মালিক নেই) অর্থ্যাৎ তওহীদ ।  এর আরো প্রমাণ পাওয়া যাবে পরবর্তী গুরাবাদের হাদিসে ।

এবার আসা যাক, খোরাসানের বিষয়ে । খোরাসান শব্দটি ফার্সি । অনেকসময় খুরাসান হিসেবেও পরিচিত । মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক অঞ্চল । মধ্যযুগের কোনও কোনও ঐতিহাসিকদের মতে, এই অঞ্চলের সীমানা পূর্বদিকে এমন কি ভারতের পশ্চিম সীমানা পর্যন্ত । এই অঞ্চলের ইতিহাস অত্যন্ত  প্রাচীন । খোরাসান শব্দটির উৎপত্তি পারসিক শব্দ ‘খোর’ বা সূর্য ও ‘আসান’ যা মধ্য পারসিক ভাষায় ক্রিয়াপদ হিসেবে এর অর্থ ‘আসা’ , আবার নামপদ ও বিশেষণ হিসেবে অর্থ ‘আলো’ বা ‘আলোকিত’ শব্দ থেকে । অর্থ্যাৎ খোরাসান শব্দটির আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় সূর্যের উদয়ভূমি বা সূর্যালোক । এই অর্থেই শব্দটি পূর্ব দিকের দেশ বোঝাতে ব্যবহৃত হয় । (উৎসঃ উইকিপিডিয়া) । এবার আসা যাক, মাহদী বলতে আল্লাহ কি শুধুই আক্ষরিক  বুঝিয়েছেন নাকি অন্যকিছু । আরবী মাহদী শব্দের অর্থ হেদায়েত প্রাপ্ত (Guided One) । অর্থ্যাৎ আক্ষরিক অর্থে উনার নাম ইমাম মাহদী নয়, বরং উনি হবেন আল্লাহর মনোনীত হেদায়েত প্রাপ্ত নেতা বা ইমাম, যিনি বিকৃত ইসলামের অন্ধকার থেকে প্রকৃত ইসলাম সবার সামনে তুলে ধরবেন, তিনিই রাসূল সাঃ এর প্রকৃত সুন্নাহ যা রাসূল সাঃ-এর ওফাতের পর তাঁর লোকেরা বিকৃত করে ফেলবে, তা পুনর্জীবিত করবেন ।

গুরাবা কারা এবং গুরাবা সম্পর্কে রাসূল সাঃ কী বলেছেন-

আরবী গুরাবা বহুবচন শব্দটি এসেছে একবচন গুরাবান শব্দটি থেকে । আবার গুরাবান শব্দটি এসেছে নামবাচক গরিব শব্দ থেকে যার অর্থ দাঁড়ায় অদ্ভূত, আশ্চর্য্যজনক (Strange) । সে অনুসারে গুরাবা শব্দের অর্থ অদ্ভূদ দলের অদ্ভূত লোকজন, যাদের দল ও দলভূক্ত লোকজনকে দেখে সব মানুষই অবাক হয়ে যাবে । এই গুরাবাদের যেনো সত্যান্বেষী মানুষ চিনতে পারে সেজন্য রাসূল সাঃ বিভিন্ন হাদিসে বিভিন্নভাবে তাদের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন । আল্লাহর রাসূল সাঃ এক হাদিসে বলেছেন, “ইসলাম অদ্ভূত অবস্থায় (গরিব) উৎপত্তি লাভ করেছে এবং অদ্ভূত অবস্থায় (গরিব) ফিরে যাবে । তাঁর এক সাহাবী প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাঃ ! কারা সেই গুরাবা? রাসূল সাঃ তখন প্রত্যুত্তর দিলেন, তারাই গুরাবা যারা ঈমান ধরে রাখবে যখন সকল মানুষই ঈমানহীন হয়ে যাবে ।”  (ইবনে মাসউদ রাঃ থেকে বর্ণিত, হাদিসটিকে আলবানি সহীহ বলেছেন ) অন্য  বর্ণনায় বলা হয়েছে, “তারা আমার সুন্নাহকে (কালক্রমে বিকৃত সুন্নাহ) ঠিক ও পরিশুদ্ধ করে দিবে, যা আমার পরে লোকজনের দ্বারা বিকৃত হয়ে যাবে ।” [আল কাবীরের তাবারানী, ৬/২০২] 

ইমাম আত-তিরমিযী তার সুনানের ২৬৩০ নং হাদিসে গুরাবাদের সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, রাসূল সাঃ বলেছেন, “সেই গুরাবাদের প্রতি মোবারকবাদ, যারা আমার সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করবে, যে সুন্নাহ আমার পরে লোকেরা বিকৃত করে ফেলবে ।” একই প্রশ্নোত্তরে গুরাবাদের প্রসঙ্গে অন্য বর্ণনায় এসেছে, “তারা খারাপ মানুষের বৃহৎ সংখ্যা সাপেক্ষে খুব অল্প সংখ্যক হবে । তাদের অনুসরণকারীদের তুলনায় তাদের বিরোধিতাকারীর সংখ্যাই হবে বেশি ।” [আব্দুল্লাহ বিন আমর আল-আস রাঃ থেকে বর্ণিত, আল ইমাম আহমদ তাঁর মুসনাদের ৬৬৯২ ও ৭১২৫ নং হাদিসে উল্লেখ করেছেন; ইবনে আসকিরের বর্ণনানুসারে, হাদিসটিকে আলবানি সহীহ বলেছেন]

এই ধরণের অন্য হাদিসে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাঃ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, “হে আল্লাহর রাসূল সাঃ ! কারা সেই গুরাবা (Strangers)? রাসূল সাঃ উত্তর দিলেন, “আন নাজ্জা' মিন আল কাবা-ইল" অর্থ্যাৎ যারা তাদের লোকজন থেকে হেজরত করেছে ।” [সুনান ইবনে মাজাহঃ হা- ৩৯৮০, মুসনাদ আল ইমাম আহমদঃ হা-৩৮১৪]

আরবী আন-নাজ্জা'র দুটি অর্থ রয়েছে ।

  1. যারা তাদেরকে সম্পূর্ণ রূপে নিজেদের গোত্র এবং পরিবার প্রথা ও ঐতিহ্য থেকে  নিজেদেরকে আলাদা করতে পেরেছে । 
  2. যারা জিহাদের উদ্দেশ্যে নিজের ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি ও দেশ ত্যাগ করতে পেরেছে । এই হাদিসগুলোর সাথে ইমাম মাহদীকে তুলনা করলে বুঝা যায়, এই গুরাবাদের নেতাই হলেন ইমাম মাহদী যিনি হেদায়েত প্রাপ্ত নেতা, যিনি রাসূল সাঃ এর সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করবেন এবং তাঁর দলভুক্ত লোকেরা সেটা প্রচার করবে । কিন্তু তাদের কথা সবার কাছে গরিব বা অদ্ভূত মনে হবে । কেনোনা, এতদিনের বিকৃত ইসলামে আবদ্ধ থেকে প্রকৃত ইসলাম তাদের কাছে আশ্চর্য্যকর লাগবে ।  এটা সহজে সবাই মেনে নিতে পারবে না । ফলে হাদিস মোতাবেক, এই গুরাবাদের অনুসারীদের তুলনায়, বিরোধীতাকারীর সংখ্যা হবে অনেকগুণ বেশি


তাহলে এ পর্যন্ত আমরা দেখলাম রাসূল সাঃ মূলত দুটি দলের কথা বলেছেন । কালোপতাকাবাহী দল যাদের সাথে ইমাম মাহদী থাকবে ও গুরাবা দল । কিন্তু রাসূল সাঃ আরেকটি হাদিসে বলে দিয়েছেন, “ওহে, অবশ্যই যারা তোমাদের পূর্বে ছিল তারা ৭২ দলে বিভক্ত ছিল এবং অবশ্যই আমার এই উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে । সকল দলই জাহান্নামে যাবে এক দল ব্যতীত । সাহাবা (রাঃ) জিজ্ঞেসা করলেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ, সেটি কোন দল? নবী (সঃ) বললেন, “আমি এবং আমার সাহাবীগণ যার (সুন্নাহ) উপর আছি, তার উপর যারা থাকবে।” [তিরমিজী ও আবু দাউদ, রেওয়ায়েতে মেশকাত শরীফ ১ম খন্ড, হাদীস নং- ১৬৩] 

অর্থ্যাৎ হাদিসে যে আরো বিভিন্ন নামে (যেমন খোরাসানের কালো পতাকাবাহীদল, জান্নাতী ফেরকা, গুরাবা, ইমাম মাহদীর দল ইত্যাদি) বিভিন্ন দলের কথা বলা হয়েছে, তারা আলাদা কোনো দল নয় । একটাই দল । উপরোক্ত হাদিসটি থেকে তাই প্রমাণ পাওয়া গেলো যে, একটি দল সঠিক হলে বাকি সবগুলো দল জাহান্নামে যাবে । অর্থ্যাৎ একাধিক দল সঠিক বা হক বা জান্নাতী দল হতে পারে না ।  

এখান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাসূল সাঃ ও তাঁর আসহাবরা কিসের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন? উত্তরটা সহজ হলেও মোটেই সহজ বিষয় নয় । এই প্রশ্নের উত্তর হলো সুন্নাহ । কিন্তু কী সেই সুন্নাহ? সাধারণ অর্থে সুন্নাহ অর্থ্যাৎ দাঁড়ি-টুপি-খুশবু ইত্যাদিকে সুন্নাহ ধরলে সব ইসলামী দলই হক দল । যেহেতু বেশিরভাগ দলই এই সুন্নাহকে আপাদমস্তক ধারণ করে । কিন্তু উপরোক্ত হাদিসটি বলছে, একটি দল সঠিক হলে বাকি সবগুলো দল জাহান্নামে যাবে । তাহলে অবশ্যই এই সুন্নাহ, সেই সুন্নাহ নয় । তাছাড়া ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, কালক্রমে সুন্নাহতে বিকৃতি ঘটবে । আর সেই সুন্নাহ পুনর্জীবিত করবেন ইমাম মাহদী ও তাঁর গুরাবানরা ।

নামায নয়, তওহীদই জান্নাতের চাবি

সুন্নাহ শব্দের অর্থ নীতি । তাহলে রাসূল সাঃ ও তাঁর আসহাবরা কোন নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন? পূর্বে একবার উল্লেখ করেছি, আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, “আপনার (মুহাম্মদ সাঃ) পূর্বে আমি (আল্লাহ) যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাঁকে এ আদেশেই প্রেরণ করেছি যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থ্যাৎ আমি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ (সার্বভৌমের মালিক বা হুকুমদাতা) নেই” (সূরা আম্বিয়াঃ ২৫) । রাসূল সাঃ এর উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে  রাসূল সাঃ নিজেই বলেছেন, “আমাকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যতক্ষণ পর্যন্ত তারা বলবে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (অর্থ্যাৎ আল্লাহ ভিন্ন কোন ইলাহ বা সার্বভৌমের মালিক নেই )” এবং সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে ।” (আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে অন্য বর্ণিত, মুসনাদে আহমেদ(ইফা)- অধ্যায়ঃ ২, হাদিস নং ৬৩; বুখারী ও মোসলেম) । অর্থ্যাৎ রাসূল সাঃ সহ পূর্ববর্তী সকল নবী রাসূলকে তওহীদের আদেশ দিয়েই প্রেরণ করা হয়েছে । তাই রাসূল সাঃএর সুন্নাহ ছিলো তওহীদের ভিত্তিতে দীনুল হক প্রতিষ্ঠা করা । তাঁর আসহাবদের ক্ষেত্রেও তাই । কারণ “জান্নাতের চাবি হচ্ছে এ সাক্ষ্য প্রদান করা যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (অর্থ্যাৎ আল্লাহ ভিন্ন কোন ইলাহ বা সার্বভৌমের মালিক নেই ) ।” (মু’আয বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মুসনাদে আহমেদ(ইফা)- অধ্যায়ঃ১, হাদিস নং ২৯; আহমদ)

অথচ আজ আমাদেরকে জানানো হয়েছে সালাত জান্নাতের চাবি । কী হাস্যকর বিষয় ! আমরা কী পরিমাণ প্রকৃত ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছি! এই সেই তওহীদ যে তওহীদের পতাকা প্রত্যেক নবী-রাসূল বহন করেছেন । এই সেই কালো পতাকা, যার আশ্রয়তলে ছিলো রাসূল সাঃ এর আসহাবরা ।

এখানে উল্লেখিত সবগুলো হাদিসের মোদ্দা ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে তা হলো - 

রাসূল সাঃ এর ওফাতের মাত্র ৬০/৭০ বছরের মাথায় তাঁর সুন্নাহর বিকৃতি ঘটবে, বিকৃতি ঘটবে আকীদার, ফলে বিকৃতি ঘটবে ইসলামের । প্রথম দীন থেকে ছিঁড়ে যাবে তওহীদ , যে তওহীদহীন দীনকে কল্পনাই করা যায় না । তারপর অন্যান্য আনুষঙ্গিক ।  দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে মুসলিমজাতিটি উম্মতে মোহাম্মদী হওয়ার সৌভাগ্য হারাবে । এভাবে বিকৃতি হতে হতে ইসলাম শেষ যামানায় চলে যাবে, যখন আলেমরা হবে আসমানের নিচে সর্বনিকৃষ্ট জীব । ঠিক এই সময়ে আল্লাহ নির্ধারিত হেদায়েতপ্রাপ্ত বা সুপথপ্রাপ্ত নেতার আবির্ভাব হবে । তিনি এসে প্রকৃত ইসলামটা সবার সামনে উপস্থাপন করবেন । অনেকে তাঁর অনুসরণ করবেন এবং তাঁরাও সেই প্রকৃত ইসলাম প্রচারণা করবেন এবং প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা) করবেন । তাঁরা যে ইসলামটির কথা সবার সামনে উত্থাপন করবেন, তা শুনে তা দেখে তখনকার সবাই (আলেম-ওলামা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ) বলাবলি করবে, এ কেমন অদ্ভূত ইসলাম ! এ কেমন গরিব কথা ! এ কেমন গরিব ইসলাম ! যেমনটি রাসূল সাঃ কে বলা হয়েছিলো । এরাই সেই গুরাবা, এরাই সেই মাহদীর দলের লোক, এরাই সেই আন নাজ্জা, যারা নিজেদেরকে নিকটস্থ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, সমাজ এমনকি দেশ থেকে পরিত্যাগ করে নিবে, প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে হেজরত করবে । এরাই সেই কালো পতাকাবাহী দল, যারা সর্বপ্রথম তওহীদের বালাগ দিবে । তওহীদের পতাকা নিয়ে দিগ্বিদিক ছুটবে । ভুলে যাওয়া তওহীদ ও প্রকৃত ইসলাম মানুষের সামনে তুলে ধরবে । এদের সংখ্যা খুবই কম হবে, কিন্তু এঁদের মর্যাদা অনেক । কারণ, একমাত্র এরাই জান্নাতে যাবে । আর বাদ বাকিরা সবাই জাহান্নামে । রাসূল সাঃ-এর বিভিন্ন হাদিস মোতাবেক এটাই সেই যামানা, এটাই সেই যুগ যার কথা বিভিন্ন হাদিসে বলা আছে । তাই হাত গুটিয়ে বসে থাকলেই হবে না । সেই কালো পতাকাবাহী দলকে আমাদেরকে খুঁজে বের করতেই হবে, যদিও আমাদেরকে বরফে কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে পার হতে হয় ।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ এই লেখাটি সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত অভিমত। প্রয়োজনের জায়গায় রেফারেন্স দেয়া হয়েছে। এর বাইরে যদি কারো মতামত/অভিযোগ (উপযুক্ত যুক্তি-প্রমাণ সাপেক্ষে) থাকে, কমেন্ট/মেইল করে জানাতে পারেন। আপনার মতামত/অভিযোগ অবশ্যই গ্রহণযোগ্য হবে।
Promotion

সব ধরণের চাকরির বিজ্ঞপ্তি ও নিউজ পেতে ক্লিক করুন

BD Job Vacancy